বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের প্রসারে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। গুগল ও ইউটিউবের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যামাজন এ বছর সম্মিলিতভাবে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন বা ৭০ হাজার কোটি ডলার খরচ করতে যাচ্ছে। প্রযুক্তির ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট খাতে এত বিশাল বিনিয়োগের নজির বিরল। তবে এ বিশাল অংকের খরচের কারণে কোম্পানিগুলোর হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছর এ চার প্রতিষ্ঠানের মূলধনি ব্যয় ৬০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। এআই প্রযুক্তির জন্য উচ্চমূল্যের চিপ কেনা, বিশাল ডাটা সেন্টার তৈরি এবং উন্নত নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই মূলত এ অর্থ ব্যয় হবে। প্রযুক্তির এ লড়াইয়ে এগিয়ে থাকতেই কোম্পানিগুলো এমন বড় ঝুঁকি নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিপুল পরিমাণ এ বিনিয়োগের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কোম্পানিগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহ বা ‘ফ্রি ক্যাশ ফ্লো’র ওপর। গত বছর এ চার প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের ২৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের তুলনায় বেশ কম। বিশ্লেষকদের ধারণা, সামনের দিনগুলোয় এ পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। কারণ কোম্পানিগুলো এখন মুনাফার চেয়ে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পরিকাঠামো উন্নয়নে বেশি জোর দিচ্ছে। ফলে কোম্পানিগুলোর আয়ের মার্জিনে চাপ পড়ছে এবং তাদের বড় ধরনের ঋণ নিতে হচ্ছে।
বিনিয়োগের এ দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে অ্যামাজন। অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয় এ মাধ্যম একাই এ বছর ২০ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। মরগান স্ট্যানলি ও ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এ বড় খরচের কারণে ২০২৬ সালে অ্যামাজনের নগদ অর্থের বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোম্পানিটি শেয়ারবাজার বা ঋণবাজার থেকে নতুন করে অর্থ সংগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে। সম্প্রতি আয়ের খতিয়ান প্রকাশের পর অ্যামাজনের শেয়ারের দাম প্রায় ৬ শতাংশ কমে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
অন্যদিকে গুগল বা অ্যালফাবেট নিজেদের ক্লাউড ব্যবসা ও ‘জেমিনাই’ মডেলের পেছনে ১৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। এ বিশাল খরচের জোগান দিতে গিয়ে কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির ঋণের পরিমাণ চার গুণ বেড়ে ৪ হাজার ৬৫০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করছেন, এ বছর অ্যালফাবেটের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাও পিছিয়ে নেই। প্রতিষ্ঠানটি এ বছর ১৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিশ্লেষকরা একে ‘বিস্ময়কর’ বলে অভিহিত করেছেন এবং আগামী দুই বছর মেটার আর্থিক অবস্থা আরো কঠিন হতে পারে বলে ধারণা করছেন। তবে মেটার চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার সুসান লি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লড়াইয়ে নিজেদের শীর্ষস্থানে রাখা।
মাইক্রোসফটের ক্ষেত্রেও চিত্রটি প্রায় একই। যদিও প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় কিছুটা ধীরগতিতে ব্যয় বাড়াচ্ছে, তবুও এ বছর তাদের নগদ অর্থের প্রবাহ ২৮ শতাংশ কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের মতো উদীয়মান এআই স্টার্টআপগুলোর তুলনায় বড় কোম্পানিগুলোর একটি বিশাল সুবিধা রয়েছে। তাদের কাছে এখনো প্রায় ৪২ হাজার কোটি ডলারের নগদ অর্থ ও সমতুল্য সম্পদ জমা আছে।
নগদ অর্থের সংকট থাকা সত্ত্বেও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এ বিপুল বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিগুলোকে লাভবান করবে। তারা বলছেন, এ বড় বিনিয়োগের ফলে এমন একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হবে, যা ছোট প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য টপকানো কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা এআইকে একটি ‘প্রজন্মগত সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাজার তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।